আমেরিকা আর মেক্সিকোর সীমান্তে একটা শহর আছে, নাম নোগালেস। শহরটা একটাই, মাঝখান দিয়ে চলে গেছে লোহার বেড়া। দুই পাশের মানুষের পূর্বপুরুষ এক, খায়ও একই খাবার। আবহাওয়াও আলাদা নয়। অথচ উত্তরের আমেরিকান অংশে একটা পরিবারের গড় আয়, বইয়ের হিসাবে, দক্ষিণের মেক্সিকান অংশের প্রায় তিন গুণ।
একই মানুষ, একই মাটি, তবু এত ফারাক কেন, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে ২০২৪ সালে অর্থনীতির নোবেল পেয়েছেন তিনজন অর্থনীতিবিদ।
তিনজন, একটা প্রশ্ন

এমআইটি, যুক্তরাষ্ট্র

এমআইটি, যুক্তরাষ্ট্র

শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্র
ছবি: অ্যাসেমোগলু, Jennifer 8. Lee, Wikimedia Commons, CC BY-SA 4.0। জনসন ও রবিনসন, John Sears, Wikimedia Commons, CC BY-SA 4.0। ছবি ক্রপ করা।
একটা দেশের প্রতিষ্ঠান কীভাবে গড়ে ওঠে, আর দেশটা ধনী হবে না গরিব থাকবে তাতে সেটা কীভাবে প্রভাব ফেলে, এই নিয়ে গবেষণার জন্যই তাঁদের এই পুরস্কার। অ্যাসেমোগলু আর রবিনসনের লেখা বই Why Nations Fail (২০১২) বইটা পড়লে এসব কথা সহজে বোঝা যায়।
দুই রকম নিয়ম
"প্রতিষ্ঠান" শুনলে অফিস-আদালতের দালান মনে হয়। তাঁরা আসলে বোঝান খেলার নিয়ম, মানে: আইন সবার জন্য সমান কিনা, জমি বা দোকান নিজের থাকবে কিনা, ব্যবসা খুলতে ঘুষ লাগে কিনা, ক্ষমতায় কে থাকবে তা মানুষ ঠিক করতে পারে কিনা।
এক রকম নিয়মকে তাঁরা বলেন অন্তর্ভুক্তিমূলক। সেখানে সম্পত্তি নিরাপদ, আইন সবার জন্য এক, আর বেশির ভাগ মানুষ অর্থনীতি ও রাজনীতিতে অংশ নিতে পারে। লাভটা নিজের ঘরে আসবে জানলে মানুষ মন দিয়ে খাটে, টাকা জমায়, নতুন কিছু করার সাহস পায়।
আরেক রকম নিয়ম শোষণমূলক। ক্ষমতা আর সম্পদ থাকে অল্প কিছু লোকের হাতে, বাকিদের আয় তারা টেনে নেয়। এমন দেশে কিছুদিন প্রবৃদ্ধি হতে পারে, কিন্তু বেশি দিন টেকে না।
উপনিবেশের লম্বা ছায়া
এই নিয়মের শিকড় খুঁজতে তাঁরা ইতিহাস ঘাঁটলেন, আর পেলেন একটা উল্টো ছবি। ইউরোপীয়রা উপনিবেশ গড়ার সময় যেসব জায়গা তুলনামূলক ধনী ছিল, সেগুলো আজ তুলনামূলক গরিব। যেখানে রোগে ইউরোপীয়দের মৃত্যুহার বেশি ছিল, সেখানে তারা থাকতে আসেনি। এসেছিল শুধু লুট করতে, আর রেখে গিয়েছিল শোষণের কাঠামো। যেখানে তারা নিজেরা বসত গড়েছিল, সেখানে নিজেদের জন্য ভালো নিয়ম বানিয়েছিল। শাসক চলে গেছে, কিন্তু অনেক জায়গায় নিয়মগুলো রয়ে গেছে।
দেশ গরিব হয় না মাটির দোষে,
হয় নিয়মের দোষে।
আমাদের ঘরের কথা
নোবেলজয়ী এই গবেষণায় বাংলাদেশ আলাদা করে আসেনি। তবে তাঁদের কথা মাথায় রেখে আমাদের দিকে তাকালে কয়েকটা সংখ্যা চোখে পড়ে। জুন ২০২৬-এ আমাদের ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের প্রায় ৩৩% খেলাপি, টাকার অঙ্কে ৬ লাখ কোটির বেশি। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতির সূচকে বাংলাদেশের নম্বর ১০০-তে মাত্র ২৪।
খেলাপি ঋণের পেছনে প্রায়ই এমন গল্প থাকে: প্রভাবশালীরা টাকা নিয়ে ফেরত দেন না, আর সেই বোঝা পড়ে সাধারণ আমানতকারীর ঘাড়ে। তাঁদের তত্ত্বে এটা শোষণমূলক নিয়মেরই লক্ষণ।
সমালোচনাও আছে। চীন তো গণতন্ত্র ছাড়াই দ্রুত ধনী হয়েছে, তাহলে? লেখকদের উত্তর, এমন প্রবৃদ্ধি সম্ভব, কিন্তু টেকসই নয়। এ নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে তর্ক এখনো থামেনি।
← আগের পর্ব: এক ব্যাগ ডালে টিকা দ্বিগুণ: গরিবি কমানোর পরীক্ষাগার
আপনার মতে বাংলাদেশে কোন একটা নিয়ম বদলালে সবচেয়ে বেশি মানুষের উপকার হতো?
পরের পর্ব: জলবায়ু পরিবর্তনের দাম কত? উইলিয়াম নর্ডহাউসের নোবেলের গল্প।
তথ্যসূত্র
- UChicago News: James Robinson shares Nobel Prize for research on global inequality
- Al Jazeera: Acemoglu, Johnson and Robinson win 2024 Nobel economics prize (১৪ অক্টোবর ২০২৪)
- Daron Acemoglu ও James A. Robinson, Why Nations Fail (২০১২), অধ্যায় ১ (নোগালেস)
- VOA: Nobel Prize brings attention to worldwide inequality
- Acemoglu, Johnson ও Robinson, "The Colonial Origins of Comparative Development", American Economic Review (২০০১); "Reversal of Fortune", Quarterly Journal of Economics (২০০২)
- প্রথম আলো: খেলাপি ঋণ, জুন ২০২৬; ইত্তেফাক: NPLs surpass Tk 6 lakh crore
- প্রথম আলো: দুর্নীতির ধারণা সূচক ২০২৫ (ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)
- The Friday Times: চীন নিয়ে সমালোচনা