ধানখেতে সোনালি ধানের আঁটি কাঁধে এক কৃষক, পেছনে ঢাকার আবছা অট্টালিকা

নোবেলের অর্থনীতি · পর্ব ২

গোলায় ধান ছিল, তবু মানুষ না খেয়ে মরল কেন?

ছবি: ধান কাটার মৌসুম। Zaheed Sarwer Khan, Wikimedia Commons, CC BY 4.0

← ব্লগে ফিরুন

১৯৪৩ সাল। শান্তিনিকেতনের এক নয় বছরের ছেলে দেখল, ক্ষুধার্ত মানুষ দলে দলে পাশ দিয়ে কলকাতার দিকে যাচ্ছে। হাড্ডিসার শরীর, হাতে থালা। কলকাতার রাস্তায় তাঁরা ভাত নয়, শুধু একটু ফ্যান চাইতেন। অথচ চালের দোকানগুলো তখনো খোলা। প্রশ্নটা ছেলেটার মাথা থেকে আর কোনোদিন যায়নি। বড় হয়ে তিনি এর উত্তর খুঁজতেই অর্থনীতি পড়েছিলেন। তাঁর নাম অমর্ত্য সেন।

সেই মন্বন্তর

পঞ্চাশের মন্বন্তরে (বাংলা ১৩৫০ সাল) অবিভক্ত বাংলায় মারা যান আনুমানিক ২০ থেকে ৩০ লাখ মানুষ। সবাই এত দিন জানত, ধান কম হয়েছিল, তাই মানুষ মরেছে।

নদীতে পাল তোলা একটি দেশি নৌকা, পেছনে কলকাতার নদীতীর
১৯৪২ সালে জাপানি আক্রমণের ভয়ে ব্রিটিশ সরকার উপকূলীয় বাংলার হাজার হাজার নৌকা কেড়ে নেয় বা নষ্ট করে। খাবার কমার আগেই জেলে আর মাঝিরা হারান রোজগার, মানে খাবার কেনার সামর্থ্য। ছবি: কলকাতার হুগলি নদীতে দেশি পালতোলা নৌকা, ১৯৪৫। Frank Bond, Wikimedia Commons, পাবলিক ডোমেইন

সেন পুরোনো সরকারি হিসাব ঘেঁটে দেখলেন, ব্যাপারটা এত সোজা নয়। ১৯৪৩ সালে বাংলায় খাবারের জোগান ছিল ১৯৪১ সালের চেয়েও বেশি, অথচ ১৯৪১-এ কোনো দুর্ভিক্ষ হয়নি।

অমর্ত্য সেন
অমর্ত্য সেন
জন্ম ১৯৩৩, শান্তিনিকেতন। পৈতৃক বাড়ি পুরান ঢাকার ওয়ারীতে

ছবি: অমর্ত্য সেন, ২০১২। Fronteiras do Pensamento, Wikimedia Commons, CC BY-SA 2.0

খাবার ছিল, কেনার সামর্থ্য ছিল না

যুদ্ধের সময় চালের দাম হু হু করে বাড়ছিল। শহরে যুদ্ধের কাজে টাকা ঢুকছিল, আর ব্যবসায়ীদের মজুতদারি দাম আরও চড়িয়েছিল। কিন্তু গ্রামের দিনমজুর, জেলে, কামার-কুমোরের আয় সেভাবে বাড়েনি।

ফলে একজন খেতমজুর সারাদিন খেটে যা পেতেন, তা দিয়ে আর এক বেলার চালও কেনা যেত না। চাল চোখের সামনেই ছিল, হাত বাড়িয়ে নেওয়ার উপায় ছিল না।

সেন এর একটা নাম দিলেন: "এনটাইটেলমেন্ট"। সহজ কথায়, নিজের জমি, শ্রম বা মজুরি দিয়ে কতটুকু খাবার জোটাতে পারি, সেই ক্ষমতা। কোনো একদল মানুষের এই ক্ষমতা হঠাৎ ধসে পড়লেই দুর্ভিক্ষ হয়। কাজ নেই, মজুরি একই জায়গায়, আর চালের দাম রোজ বাড়ছে।

পুরনো ধারণা খাবার কম দুর্ভিক্ষ সেনের ব্যাখ্যা চালের দাম চড়ে মজুরি থমকে থাকে কেনার সামর্থ্য শেষ দুর্ভিক্ষ খাবার থাকলেও
দুর্ভিক্ষ মানে শুধু খাবারের অভাব নয়, খাবার কেনার সামর্থ্যের অভাব। (ThinkLab)
খাবার বাজারেই ছিল,
শুধু মানুষের নাগালের বাইরে।

গণতন্ত্র কেন খাবার বাঁচায়

সেনের আরেকটা কথা খুব বিখ্যাত: যেখানে সত্যিকারের গণতন্ত্র আর স্বাধীন সংবাদমাধ্যম আছে, সেখানে বড় দুর্ভিক্ষ হয়নি। পত্রিকায় খবর ছাপা হলে, বিরোধীরা হইচই করলে, পরের ভোটের কথা ভেবে সরকার চুপ থাকতে পারে না। ১৯৪৩-এর বাংলা চলছিল ঔপনিবেশিক শাসনে, সেখানে এই চাপ ছিল না।

এসব কাজের জন্যই ১৯৯৮ সালে তিনি অর্থনীতিতে নোবেল পান, প্রথম এশীয় হিসেবে।

চুয়াত্তরে আর আজকের বাজারে

১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের দুর্ভিক্ষ নিয়েও সেন একই কথা দেখিয়েছিলেন: বন্যায় গ্রামের কাজ হারিয়ে গিয়েছিল, চালের দাম লাফিয়ে বেড়েছিল। অথচ সেই বছর মাথাপিছু খাবারের জোগান ছিল ১৯৭১ থেকে ১৯৭৫-এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি।

আজও যখন চালের দাম বাড়ে, সবার আগে বিপদে পড়েন দিনমজুর আর স্বল্প আয়ের মানুষ। তাই খোলাবাজারে কম দামে চাল বিক্রি, টিসিবির কার্ড বা কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচিকে দান-খয়রাত ভাবলে ভুল হবে। সেনের যুক্তি ধরলে, এগুলো মানুষের কেনার সামর্থ্য টিকিয়ে রাখার উপায়।

← আগের পর্ব: দামের ভয়েই দাম বাড়ে, এবারের নোবেলের গল্প

আপনার বাড়ির বড়দের কাছে কি পঞ্চাশের মন্বন্তর বা চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের কোনো গল্প শুনেছেন?

পরের পর্ব: গরিব মানুষকে সাহায্যের কোন উপায় সত্যিই কাজ করে? অভিজিৎ ব্যানার্জি, এস্থার ডুফলো ও মাইকেল ক্রেমারের নোবেলের গল্প →

তথ্যসূত্র

  1. NobelPrize.org: Amartya Sen, Biographical
  2. Britannica: Bengal famine of 1943
  3. Amartya Sen, Poverty and Famines: An Essay on Entitlement and Deprivation (Oxford, 1981), অধ্যায় ৬ ও ৯
  4. Amartya Sen, Development as Freedom (1999)